আমাদের চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। একটি স্থানে যে সকল জড়বস্তু ও জীব থাকে সেগুলো নিয়েই সেখানকার পরিবেশ গড়ে উঠে। ভূমণ্ডলের পরিবেশকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় — স্বাদু পানি, লোনা পানি ও স্থল।
Study sheet: Environment and Ecosystem
Structured notes written from the textbook, with page references.
আমাদের চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। একটি স্থানে যে সকল জড়বস্তু ও জীব থাকে সেগুলো নিয়েই সেখানকার পরিবেশ গড়ে উঠে। ভূমণ্ডলের পরিবেশকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় — স্বাদু পানি, লোনা পানি ও স্থল। এই তিন রকমের পরিবেশের প্রত্যেকটিতে স্বতন্ত্র ধরনের অজীব ও জীব উপাদান থাকে, এবং এসব উপাদান একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে — বাস্তুতন্ত্র কী, এর অজীব ও জীব উপাদান (উৎপাদক, খাদক, বিয়োজক), বাস্তুতন্ত্রের প্রকারভেদ (স্থলজ ও জলজ), খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজাল, বাস্তুতন্ত্রে শক্তি প্রবাহ (একমুখী) ও পুষ্টিদ্রব্যের চক্রাকার প্রবাহ, এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা।
শিখনফল
(পৃষ্ঠা 147) — এ অধ্যায় শেষে আমরা–
বাস্তুতন্ত্রের উপাদান ও প্রকারভেদ ব্যাখ্যা করতে পারব;
খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজাল ব্যাখ্যা করতে পারব;
বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ ব্যাখ্যা করতে পারব;
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে পারব;
জীবে বাস্তুতন্ত্রের অবদান উপলব্ধি করব এবং সুরক্ষায় অন্যদের সচেতন করতে পারব।
মূল আলোচনা
ভূমিকা (পৃষ্ঠা 147)
আমাদের চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ।
একটি স্থানে যে সকল জড়বস্তু ও জীব থাকে সেগুলো নিয়েই সেখানকার পরিবেশ গড়ে উঠে।
ভূমণ্ডলে বিভিন্ন পরিবেশ রয়েছে। এসব পরিবেশকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
স্বাদু পানি
লোনা পানি
স্থল
এই তিন রকমের পরিবেশের প্রত্যেকটিতে স্বতন্ত্র ধরনের অজীব ও জীব উপাদান থাকে।
এসব অজীব ও জীব উপাদানসমূহ একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পরিবেশের জীব উপাদানসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী; জীবন ধারণের জন্য এসকল উদ্ভিদ ও প্রাণী একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
পাঠ ১: বাস্তুতন্ত্র (পৃষ্ঠা 148)
পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন জীব বসবাস করে। প্রতিটি বাসস্থানের বিভিন্ন এলাকায় জলবায়ু, আবহাওয়া ও অন্যান্য অজীব এবং জীব উপাদানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। এসব পার্থক্যের কারণে পৃথিবীজুড়ে স্থানভেদে বিচিত্র সব জীবের বসতি।
বনজঙ্গলে যে ধরনের জীব দেখা যায়, পুকুরে বসবাসরত জীব তাদের থেকে ভিন্ন।
এসব পরিবেশের জীব ও অজীব উপাদানের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। একটি পরিবেশের উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবন ধারণের জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল।
সংজ্ঞা — বাস্তুতন্ত্র: যে কোনো একটি পরিবেশের অজীব এবং জীব উপাদানসমূহের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া, আদান-প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবেশে যে তন্ত্র গড়ে উঠে, তাই বাস্তুতন্ত্র নামে পরিচিত।
পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় বাস্তুতন্ত্রের সকল উপাদানের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে।
উদাহরণ: তোমার বাড়ি অথবা বিদ্যালয়ের কাছের বাগান একটি ছোটো বাস্তুতন্ত্রের উদাহরণ।
পাঠ ২: বাস্তুতন্ত্রের উপাদান (পৃষ্ঠা 148–149)
অজীব এবং জীব — এই দুটি প্রধান উপাদান নিয়ে বাস্তুতন্ত্র গঠিত।
অজীব উপাদান
অজীব উপাদান: বাস্তুতন্ত্রের প্রাণহীন সব উপাদান অজীব উপাদান নামে পরিচিত।
এই অজীব উপাদান আবার দুই ধরনের:
ভাগ
কী কী
মন্তব্য
(ক) অজৈব বা ভৌত উপাদান
বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ, মাটি, আলো, পানি, বায়ু, তাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি
প্রাণহীন ভৌত উপাদান
(খ) জৈব উপাদান
সকল জীবের মৃত ও গলিত দেহাবশেষ
মৃতদেহ থেকে আসা জৈব পদার্থ
পরিবেশের জীব উপাদানের বেঁচে থাকার জন্য এসব অজৈব ও জৈব উপাদান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জীব উপাদান
জীব উপাদান: পরিবেশের সকল জীবন্ত অংশই বাস্তুতন্ত্রের জীব উপাদান।
বাস্তুতন্ত্রের সকল জীব ও অজীব উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে।
বাস্তুতন্ত্রকে কার্যকরী রাখার জন্য এ সকল জীব যে ধরনের ভূমিকা রাখে, তার উপর ভিত্তি করে জীব উপাদানকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
(ক) উৎপাদক
(খ) খাদক
(গ) বিয়োজক
(ক) উৎপাদক(পৃষ্ঠা 148)
উৎপাদক:সবুজ উদ্ভিদ যারা নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে, তারা উৎপাদক নামে পরিচিত।
যারা উৎপাদক তারা সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে।
এর উপর বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য সকল প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।
(খ) খাদক বা ভক্ষক(পৃষ্ঠা 148–149)
খাদক বা ভক্ষক: যে সকল প্রাণী উদ্ভিদ থেকে পাওয়া জৈব পদার্থ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে বা অন্য কোনো প্রাণী খেয়ে জীবন ধারণ করে, তারাই খাদক বা ভক্ষক নামে পরিচিত।
বাস্তুতন্ত্রে তিন ধরনের খাদক রয়েছে:
স্তর
সংজ্ঞা
উদাহরণ (বইয়ের)
প্রথম স্তরের খাদক
যে সকল প্রাণী উদ্ভিদভোজী; এরা তৃণভোজী নামেও পরিচিত। তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ছোটো কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে অনেক বড়ো প্রাণী
গরু, ছাগল ইত্যাদি
দ্বিতীয় স্তরের খাদক
যারা প্রথম স্তরের খাদকদেরকে খেয়ে বাঁচে; এরা মাংসাশী প্রাণী হিসেবেও পরিচিত
পাখি, ব্যাঙ, মানুষ ইত্যাদি
তৃতীয় স্তরের খাদক বা সর্বোচ্চ খাদক
যারা দ্বিতীয় স্তরের খাদকদের খায়
কচ্ছপ, বক, ব্যাঙ, মানুষ ইত্যাদি
সর্বভুক: তৃতীয় স্তরের খাদকদের মধ্যে কোনো কোনো প্রাণী আবার একাধিক স্তরের খাবার খায়। এদেরকে বলা হয় সর্বভুক।
বইয়ের নিজের উদাহরণ: আমরা যখন ডাল, ভাত, আলু ইত্যাদি খাই, তখন আমরা প্রথম স্তরের খাদক। আবার আমরা যখন মাছ, মাংস খাই, তখন আমরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের খাদক।
(গ) বিয়োজক(পৃষ্ঠা 149)
বিয়োজক: এরা পচনকারী নামেও পরিচিত। পরিবেশে কিছু অণুজীব আছে, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক, যারা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের উপর ক্রিয়া করে।
বিয়োজনের ধাপ (বইয়ের ক্রম অনুসারে):
মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে।
ফলে মৃতদেহ ক্রমশ বিয়োজিত হয়ে নানা রকম জৈব ও অজৈব দ্রব্যাদিতে রূপান্তরিত হয়।
এসব দ্রব্যের কিছুটা ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক নিজেদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
মৃতদেহ থেকে তৈরি বাকি খাদ্য পরিবেশের মাটি ও বায়ুতে জমা হয়, যা উদ্ভিদ পুনরায় ব্যবহার করে।
এভাবে প্রকৃতিতে অজীব ও জীব উপাদানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়ে বাস্তুসংস্থান সচল থাকে।
এ ধরনের বাস্তুতন্ত্র আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন– বনভূমির বাস্তুতন্ত্র, মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র ইত্যাদি।
বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের বনভূমি অঞ্চলের কথা বলা যায়।
বাংলাদেশের বনভূমি অঞ্চলকে প্রধান তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
ভাগ
অঞ্চল
(ক)
সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল
(খ)
খুলনার সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন অঞ্চল
(গ)
টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের শালবন অঞ্চল
সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র(পৃষ্ঠা 149)
সুন্দরবনের বনভূমি অন্যান্য অঞ্চলের বনভূমি থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। খুলনা জেলার দক্ষিণে সমুদ্র উপকূল থেকে ভিতরের দিকে এ অঞ্চল বেশ কয়েক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।
জোয়ার–ভাটার কারণে এ অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বেশি, কাজেই লবণাক্ত পানি সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ভিদই এ বনাঞ্চলে জন্মে।
সুন্দরবনের বনাঞ্চল ম্যানগ্রোভ বন নামে পরিচিত।
এ বনের মাটি বেশ কর্দমাক্ত; কাজেই এর ভিতর দিয়ে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে না। তাই এখানকার উদ্ভিদের মূল মাটির নিচে না গিয়ে খাড়াভাবে মাটির উপরে উঠে আসে (শ্বাসমূল)। এসব মূলের আগায় অসংখ্য ছিদ্র থাকে, যার সাহায্যে উদ্ভিদ শ্বসনের জন্য বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করে।
সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জীব উপাদান (বইয়ের শ্রেণিবিভাগ অনুসারে):
ভূমিকা
জীব
উৎপাদক
সুন্দরী, গরান, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা ইত্যাদি
প্রথম স্তরের খাদক
পোকামাকড়, পাখি, মুরগি, হরিণ
দ্বিতীয় স্তরের খাদক
বানর, কচ্ছপ, সারস ইত্যাদি
তৃতীয় স্তরের খাদক
বাঘ, শূকর ইত্যাদি
সর্বভুক
এ সবের মধ্যে শূকর সর্বভুক
এ বনের উল্লেখযোগ্য প্রাণী: রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতা বাঘ, বানর, চিত্রল হরিণ, বন্য শূকর, কুমির, নানা ধরনের সাপ, পাখি এবং কীটপতঙ্গ।